বিএনপি চায়, আওয়ামী লীগের না – কি হতে যাচ্ছে সামনে ?

প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে যে নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলেছেন, সেটা বিএনপির কাছে পরিষ্কার নয়। তাই দলটি বলছে, এই বিষয়ে সংলাপ হতে পারে। কিন্তু সরকারি দল আওয়ামী লীগ বলছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরদিনই নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে সংলাপ বা আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে আগের মতো সরাসরি বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়েছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল।

সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বতোভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।’

এর ব্যাখ্যায় আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ এক নেতা বলছেন, বর্তমান সরকারই হবে নির্বাচনকালীন সরকার। এতে বিএনপির ঠাঁই হবে না।অপর দিকে বিএনপি চায় এমন একটি সরকার, যারা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে।

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সংবিধানে সরাসরি কিছু বলা নেই। তবে ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভার সদস্যসংখ্যা কমিয়ে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠন করে আওয়ামী লীগ। এই সরকারে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) রাখা হয়েছিল।

অন্য দল থেকে তিনজনকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়, যাঁরা নির্বাচিত ছিলেন না। এর আগে প্রধানমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচনে অংশ নিলে বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এবার নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে, তা নিয়ে নিশ্চিত নন আওয়ামী লীগের নেতারাও। নির্বাচন কমিশনের সামনেও এর কাঠামো স্পষ্ট নয়।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল বিবিসি বাংলাকে বলেন, সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারই হবে নির্বাচনকালীন সরকার। অন্য কিছু না। অন্য দল থেকে লোক নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে, এমন কথা প্রধানমন্ত্রী বলেননি। বর্তমান সরকার হবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যারা শুধু দৈনন্দিন কাজগুলো করবে।

পরিষ্কার হতে সংলাপ চায় বিএনপি

গতকাল শনিবার বিকেলে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায় বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন, তা খুবই অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর।

তাঁর ভাষণ জাতিকে হতাশ, বিস্ময়-বিমূঢ় ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি আন্তরিকভাবে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে নতুন কিছু ভেবে থাকেন, তাঁর উচিত হবে এ নিয়ে সব অংশীজনের (স্টেকহোল্ডার) সঙ্গে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়া।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের দল মনে করে, একটি আন্তরিক ও হৃদ্যতাপূর্ণ সংলাপের মাধ্যমে ২০১৮-এর নির্বাচন সম্পর্কে অর্থবহ সমাধানে আসা সম্ভব। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হতে পারে, তা নিয়ে আমাদের দলের একটি চিন্তাভাবনা আছে।’

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হচ্ছে, সংবিধানে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো বিধান নেই। নির্বাচনকালীন সরকার যে কেবল দৈনন্দিন কাজ করবে, এরও উল্লেখ নেই। সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেছেন, নির্বাচনকালীন সরকারের কথা বলে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন। মূল কথা হলো, এই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, সেটাই তিনি বলার চেষ্টা করেছেন।

নির্বাচনকালীন সরকার বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হারুন অর রশীদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। আওয়ামী লীগের নেতারা আগাগোড়াই বলে আসছেন, বর্তমান যে সরকার আছে সেটিই হবে নির্বাচনকালীন সরকার।

এর আকার ছোট হবে। নির্বাচন কমিশনকে সর্বতোভাবে সহায়তা করবে, রুটিন কাজ করবে, নীতিনির্ধারণী কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না বিএনপির দাবি অনুসারে তত্ত্বাবধায়ক বা তথাকথিত নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা হবে।’

নির্বাচন বিএনপির অধিকার, সুযোগ নয়

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গত শুক্রবার রাতেই অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে রাখা হয় যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ নিয়ে বিএনপি প্রতিক্রিয়া দিলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও সংবাদ সম্মেলন করবেন। বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে গতকাল বেলা তিনটার দিকে। বিকেল পাঁচটার পর আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ওবায়দুল কাদের।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সংবিধানে নির্বাচনের বিষয়ে পথনির্দেশনা দেখানো আছে। সেই পথ নিয়ে আবার সংলাপের প্রয়োজন কেন? নির্বাচন বিএনপির অধিকার, সুযোগ নয়।’ তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য সরকার নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করবে। এ বিষয়ে সংলাপের কোনো প্রয়োজন নেই। সংলাপ করার পরিবেশ বিএনপি রাখেনি। সামনে কোনো সংকট কিংবা সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি হলে তখন দেখা যাবে।

কী ধরনের সংকট হলে সংলাপ হবে? ‘জ্বালাও-পোড়াও’ ধরনের আন্দোলনকে সংকট বলছেন? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘যদি কোনো সংকটের মুহূর্ত আসে, সেই পরিস্থিতিতে বিএনপি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করতে পারবে না।

তারা কি আগের মতো আগুন–সন্ত্রাস করে মানুষ পুড়িয়ে মারবে? জনগণ বিএনপির কথায় আর সায় দেবে না। যদি তারা আগুন–সন্ত্রাস করে, জনগণ এর জবাব দেবে। আর তখন তাদের সঙ্গে মাঠেই সংলাপ হবে।’

গত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সংলাপ চেয়েছিল উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, নির্বাচনের জন্য আওয়ামী লীগ কি সংলাপ করতে চায়নি? বিএনপি রাজনৈতিকভাবে স্টান্টবাজি করতে গিয়ে সেই সুযোগ হারিয়েছে।

তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, ভবিষ্যতে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এ ধরনের নির্বাচনের ব্যবস্থা করার দায়িত্ব ক্ষমতাসীনদের ওপর বর্তায়।

দেশের বিবদমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার মানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সংসদ বহাল রেখে এ ধরনের সরকার হয় না। সংলাপের আহ্বান নাকচ করে দেওয়া দুঃখজনক। কারণ, গণতন্ত্র মানেই সংলাপ-সমঝোতা।

২০১১ সালে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাদ দেওয়ার পর থেকে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য তৈরি হয়। এর ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ দলটির নেতৃত্বাধীর জোটসহ আরও অনেক দল।

বিএনপি চায় এমন একটি সরকার, যারা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রেখে সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। আর আওয়ামী লীগ তাদের আমলে সংশোধিত সংবিধানের বাইরে যেতে রাজি নয়। এখনো বড় দুই দল নিজ নিজ অবস্থানে অনড় রয়েছে। এই অবস্থায় সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যে আকাঙ্ক্ষা, তা শঙ্কামুক্ত হয়নি বলে মনে করা হচ্ছে।

সূত্র: প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *