সালমান যদি ফিরে আসতেন…তবে কি হতো???

তখন মুক্তিযুদ্ধে উত্তাল দেশ। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিলেটে জন্ম নেওয়া চৌধুরী সালমান শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ বেঁচে থাকলে এ বছর ৪৭-এ পা রাখতেন। ৪৬তম জন্মবার্ষিকীর আগে তাঁকে নিয়ে লিখেছেন মাসুম আলী

১৯৯৩ খ্রিষ্টীয় বছরের ১৪ এপ্রিল। সেদিন ছিল বঙ্গাব্দ ১৪০০ সালের প্রথম দিন। ওয়ারীর ফাহমিদা বেগম আর সহপাঠীদের নিয়ে বের হয়েছিলেন নববর্ষ উদ্যাপনে। সারা দিন সবাই মিলে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন ঢাকা শহরে। সে দিনটির স্মৃতি ঝলমল করছে ফাহমিদার মনে। কেননা সেদিন ঢাকার রাস্তায় এক নায়ককে দেখেছিলেন ট্রাকে করে ঘুরে বেড়াতে। মৎস্য ভবনের মোড়ে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন নায়ক। তাঁকে ঘিরে সে কী উত্তেজনা অগণিত মানুষের! ভক্তদের শুভেচ্ছার জবাব দিচ্ছিলেন হাত নেড়ে, উড়ন্ত চুম্বন ছুড়ে দিয়ে নায়ক—সালমান শাহ।

ফাহমিদা এখন একটি সরকারি মহিলা কলেজের সহকারী অধ্যাপক। নিজের জীবনে ওই দিনের গল্পটা অনেকবার করেছেন। সেদিন তিনি দেখেছেন একজন মানুষ কতটা ‘নায়ক’ হয়। তাঁর মতে, বাংলাদেশে নায়ক ওই একজনই ছিল—সালমান শাহ!

ওই সময়টাতে গাইবান্ধায় স্কুলপড়ুয়া কিশোরী পাঁচ বোনের ঘুম কেড়েছিল নায়ক সালমান শাহ। পাঁচ বোন যে স্কুলে পড়াশোনা করতেন, তাঁর পাশেই ছিল স্টেশনারি দোকান। সেখানে সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের ভিউকার্ডও পাওয়া যেত। স্কুলে টিফিন খাওয়ার জন্য বাবা তাঁদের যে টাকা দিতেন, সেখান থেকে টাকা জমিয়ে তাঁরা প্রিয় নায়ক সালমানের ভিউকার্ড কিনতেন। আর স্টুডিও থেকে ফটো অ্যালবাম কিনে এনে ভিউকার্ডগুলো খুব যত্নে রেখে দিতেন। যখন প্রিয় নায়ককে দেখতে ইচ্ছে করত, পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফটো অ্যালবামে থাকা সালমানের ভিউকার্ডগুলো বের করে দেখতেন। এমন যে কত দিন গেছে!

ফেনীর ছাগলনাইয়া থানার করৈয়া বাজারের ফকরুল জনি। সালমান যখন মারা যান, তখন তাঁর বয়স হবে ৯ কিংবা ১০। অথচ এই ফকরুলের ধ্যান, জ্ঞান সালমান। তাঁর জীবনের একটা স্বপ্ন, নায়ক হবেন। তাই সবকিছু ছেড়ে ঢাকায় এসে ছবিপাড়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন দিনের পর দিন। হাঁটাচলা, কথা বলা, ছবি তোলা—সবকিছুতেই সালমানের অনুকরণ। কাকরাইল কিংবা এফডিসিতে তাঁকে প্রায়ই দেখা যায়। নায়ক হওয়ার জন্য নতুন নামও দিয়েছেন নিজের, শান আহমেদ।

এমন কত গল্প জমে আছে সালমান শাহকে নিয়ে। ঢাকাই চলচ্চিত্রে তাঁর আবির্ভাব ছিল আঁধারে আলোর ঝলকানির মতো। চলে গেছেন বছর ২০ হয়ে গেল। অথচ এখনো ভক্তরা কী যতনে তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে আছে। এখনো যেন তিনি বর্তমান। এখনো আরিফিন শুভ, ইমন, নীরবরা অকপটে জানিয়ে দেন, সালমানের অন্ধভক্ত তাঁরা। এখনো শাবনূর, মৌসুমীরা চোখের পানি ফেলেন সহশিল্পী, বন্ধুর কথা মনে করে। পড়শিরা লাইভ অনুষ্ঠানে সালমানের ছবির গান তোলেন, ‘তুমি আমার মনের মানুষ মনেরই ভেতর…।’

এসব এমনি এমনি হয়নি। ৯০-এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর ঢাকাই চলচ্চিত্রে পরিবর্তনের হাওয়া লাগে। এর আগে বেদের মেয়ে জোছনার মতো ছবি তুমুল সাফল্য পায়। ধারাবাহিকভাবে সে ধরনের ছবি তৈরি হতে থাকে। দর্শক যখন বাংলা ছবির নায়কদের যাত্রাপালার মতো একই ধাঁচের পোশাকে দেখে বিরক্ত হয়ে গেছে, তখন সালমান এই প্রচলিত ধারার বিপরীতে পোশাক-আশাকে নিয়ে এলেন আধুনিকতার ছোঁয়া। কখনো হ্যাট ও লম্বা কোটে পশ্চিমা লুক কিংবা টি-শার্ট বা লং শার্টের সঙ্গে নানা রকমের পশ্চিমা কোট থেকে শুরু করে স্যুট-টাই পরে কেতাদুরস্ত, কখনো শার্টের কলার উঠিয়ে কিংবা হাফহাতা গেঞ্জি, জিনস ওপরের দিকে ভাঁজ, হুডি-শার্ট কখনো ইন করে আবার ওপেনে রেখে বিচিত্র লুক, কাউবয় বা জমিদারি পোশাকে, কবি-সাহিত্যিকের প্রতীকী পাঞ্জাবি, পর্দায় হাজির হতে দেখা গেছে সালমানকে। হাফহাতা পলো টি-শার্টের হাতা ভাঁজ করে পরা সালমান শিখিয়েছেন। ফেড জিনসের হাঁটুতে রুমাল বেঁধেছেন সালমান। পশ্চিমা পোশাকে তাঁকে যেমন মানিয়ে যেত, তেমনি আটপৌরে জামায় বেশ লাগত।

ঢাকা এমনকি মফস্বল শহরেও রাস্তার রোমিওদের ফ্যাশন আইকন সালমান। ব্যাকব্রাশ করা চুল, কানের দুল, রং-বেরঙের টুপি, সানগ্লাস, ফেড জিনস, মাথায় স্কার্ফ, কত স্টাইল যোগ করলেন সালমান। লাল কিংবা কালো নকশায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত স্কার্ফের ব্যবহার ছিল সালমানের। আকারে বড় শার্ট গুঁজে রেখেছিলেন প্যান্টের এক পাশে। মাঝে চুল কিছুটা বড় রেখেছিলেন, ছোট ঝুঁটি বাঁধা সেই চল কি এখনকার তরুণদের মাঝে দেখা যায়।

শোনা যায়, যেকোনো ছবিতেই পরিচালক পোশাক নির্বাচনের ব্যাপারটা সালমানের ওপর ছেড়ে দিতেন। ফরমাল পোশাক পরবেন নাকি ক্যাজুয়াল লুক নেবেন, সেই সিদ্ধান্ত সালমানই নিতেন। যেকোনো প্রয়োজনে আউটডোরে গেলে কিংবা শুটিংয়ের জন্য দেশের বাইরে গেলে ফিরে আসার সময় তাঁর সঙ্গে থাকত নানা ধরনের পোশাক-আশাক ভর্তি ছয়-সাতটি লাগেজ।

শুধু কি ফ্যাশন শিখিয়েছেন সালমান? দিয়েছেন আরও বেশি। বড় পর্দায় তাঁর ক্যারিয়ার মাত্র তিন-চার বছর। করেছেন মাত্র ২৭টি ছবি। অথচ প্রদর্শকদের দেওয়া তথ্য বলছে, বাংলাদেশে সর্বকালের সর্বাধিক ব্যবসাসফল ১০টি ছবির মধ্যে ৩টি সালমানের। তথ্য বলছে, এযাবৎ বাংলাদেশে সব থেকে ব্যবসাসফল ছবি বেদের মেয়ে জোসনা। সারা দেশে ১ হাজার ২০০ প্রেক্ষাগৃহে চলা এই ছবি ২০ কোটি মাইলফলক ছুঁয়েছিল। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সালমান শাহ অভিনীত স্বপ্নের ঠিকানা ছবিটি। আয় করেছিল ১৯ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানেও আছে সালমানের সত্যের মৃত্যু নেই ছবিটি। আয় করে ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। সালমান অভিনীত প্রথম ছবি কেয়ামত থেকে কেয়ামত আছে সর্বাধিক ব্যবসাসফল ছবির চতুর্থ স্থানে, আয় করেছিল ৮ কোটি ২০ লাখ টাকা।
উচ্চতা বলতে তেমন কিছু ছিল না, ৫ ফুট ৮। গল্প, উপন্যাসে বেশি বর্ণিত নায়কদের মতো নয়। ফরসা, অনেকটা গোলগাল চেহারার সালমানকে প্রথম ছবি কেয়ামত থেকে কেয়ামত দেখে অনেকে ভেবেছিলেন পর্দায় সুন্দরী নায়িকাদের সঙ্গে প্রেম আর নাচানাচি করাতেই সীমিত থাকবে এ তরুণ। কিন্তু পরে দেখা গেল, অল্প সময়ের ব্যবধানে নিজেকে বারবার ভেঙেছেন, মাথায় ব্যানডানা বেঁধে ভিলেনদের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করাতেও তিনি তিনি যথেষ্ট পারদর্শী। কলেজের মেধাবী ছাত্র হয়ে ভালো ফলাফল করার পাশাপাশি আবার ছাত্রনেতা হিসেবেও মানিয়ে যেত তাঁকে। স্বপ্নের পৃথিবী ছবিতে জমিদারপুত্র হয়ে আবার চলে গেছেন রাখাল বালকের বেশে, দুটো চরিত্র সাবলীল ফুটিয়ে তুলেছেন।

একটা ছবিতে সালমান বেশ অভিমান করে আছেন। হাতের পাঁচ আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে চোখ বন্ধ করে চাকু চালাচ্ছেন। চাকু আঙুলে লাগছে না, টেবিলে লাগছে। এই না হলে কি নায়ক!

এমন কত কী করেছেন এ নায়ক। অগণিত মানুষের মন জয় করেছেন। হ্যামিলিনের বাঁশিবাদকের মতোই সবাইকে সম্মোহিত করে দিয়ে নিজে অনেক দূরে চলে গেলেন কিন্তু তাকে ভুলতে দেননি! শুধু পারেননি ফিরে আসতে। যদি সালমান ফিরে আসতেন, তাহলে তাঁর এ পরিণত বয়সে ঢাকাই চলচ্চিত্রের চিত্রটা অন্য রকম হতো। যদি ফিরে আসতেন, তাহলে হয়তো এফডিসি থাকত আগের মতোই জমজমাট। যদি ফিরে আসতেন, তাহলে হয়তো যৌথ প্রযোজনা, দেশি ছবি, বিদেশি ছবি এসব নিয়ে ঝগড়া-বিবাদের হিসাব-নিকাশটা অন্য রকম হতো। ফিরে যদি আসতেন সালমান, হয়তো ঈদে ছবি মুক্তির তালিকাটা আরও বড় হতো। নায়কেরা সব পারলেও ফিরে আসতে পারেন না—এটাই বাস্তবতা।

এ বাস্তবতা মেনে আগামী মঙ্গলবার যখন ভক্তরা সালমানের জন্মদিন উদ্যাপন করবে, তখন তিনি অনতিক্রম্য দূরত্বে। তিনি কি দেখবেন ছেড়ে যাওয়া সঙ্গী ও অনুরাগীরা কী গভীর শ্রদ্ধা ও নিখাদ ভালোবাসায় স্মরণে রেখেছে তাঁকে? এ প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই, তবু মানুষ বুকভরা আশা নিয়ে, প্রগাঢ় বিশ্বাস নিয়ে থাকে যে লোকান্তরে চলে যাওয়া স্বজন নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন তাঁদের নিবেদিত শ্রদ্ধা, ব্যথাতুর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com