মানব পাচার, কিছুতেই থামছেনা লিবিয়ার কান্না!

মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার স্বরমঙ্গল গ্রামের জুয়েল বেপারী, অনেক স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল লিবিয়ায়। সহায়-সম্বল বিক্রি করে জোগার করেছিল বিদেশ যাওয়ার টাকা।
হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমের মাঝেও প্রথম দিকে ভালোই কাটছিল দিন।

লিবিয়ায় এক বাঙালী মানব পাচারকারী চক্রের সাথে পরিচয়ের পরেই বদলে যায় তার জীবন। তাকে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মানবপাচারকারী চক্রের বন্দিশিবিরে। চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। সেই নির্যাতনের চিত্র দেখে স্বজনদের কাছ আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা। টাকা দিতে না পারলে চালানো হচ্ছে নির্যাতন।

এসব ঘটনা প্রশাসনকে জানানোর কারণে জিম্মিদের হত্যার হুমকিও দিচ্ছে পাচারকারী চক্র। এমনই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে মাদারীপুর র‌্যাবের হাতে আটক এক মানবপাচারকারী। গ্রেফতারের পর তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৫৯টি সিম, ২৯টি মোবাইল ও ১৮ লাখ টাকা।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৮ এর মাদারীপুর ক্যাম্প কমান্ডার মেজর রাকিব জানান, দীর্ঘদিন যাবৎ একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারী চক্র ইটালী, স্পেন ও গ্রীসসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মোটা অঙ্কের বেতনের চাকুরীর লোভ দেখিয়ে মানব পাচার করে আসছে।

এই চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশ, লিবিয়া ও ইটালিসহ গোটা ইউরোপে সক্রিয় এবং এদের শিকার মূলত মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের উঠতি বয়সের বেকার যুবকরা। চক্রটি বাংলাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে যুবকগণকে লিবিয়ায় পাচার করে থাকে। পরে লিবিয়ায় অবস্থানরত চক্রের সদস্যরা লিবিয়ার বন্দিশালায় তাদেরকে আটক রেখে বিভিন্নভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে এবং বন্দীদের নিকট আত্মীয়দের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা দাবী করে।

এছাড়াও লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রবাসীদের টার্গেট করে এই চক্রটি। ভালো কাজ এবং মোটা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারন মানুষকে তাদের বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। এই চক্রের সাড়ে জড়িত থাকার অভিযোগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর শরিয়তপুরের নড়িয়া থানার পশ্চিম লোনসিং গ্রাম থেকে আব্দুল হামিদ ছৈয়ালের ছেলে সুমন ছৈয়ালকে গ্রেফতার করে।

গ্রেফতারকৃত সুমন ছৈয়াল প্রাথমিকভাবে লিবিয়ায় ১৫ থেকে ২০ জনকে জিম্মির কাছ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করেছে। বন্দিশিবিরে আটক আছে জুয়েল শেখ, ইমন বেপারী, হাসান বেপারী, জুয়েল বেপারী, দাদন মাতুব্বর, হাসান আহম্মেদসহ শতাধিক যুবক। কিছুতেই থামছেনা এই পরিবারগুলোর কান্না।

বন্দিশালায় আটক জুয়েল বেপারীর বাবা জামাল বেপারী কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, আমার ছেলে লিবিয়াতে ভালোই ছিলো। মোটা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বন্দিশালায় আটকে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। সেই নির্যাতনের চিত্র পাঠানো হয় স্বজনদের কাছে। দাবী করা হয় মুক্তিপণ।

ইমন বেপারীর বাবা লোকমান জানান, আমরা গরীব মানুষ। কিভাবে এতো টাকা দিবো। আমার সন্তান উদ্ধারে সরকারের সাহায্য চাই। এরকম শতাধিক পরিবারে বইছে কান্নার রোল। কিছুতেই থামছেনা কান্না।

এর আগে র‌্যাব সিরাজুল ইসলাম নামে এক পাচারকারীকে আটক করে। পুলিশ আটক করেছে আলমগীর হোসেন রিপন,নয়ন আক্তার ও সামচুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আটকের পরে এরা আরো বেপরোয়া হয়েছে। বাংলাদেশে আটককৃতদের ছেড়ে দেয়া না হলে লিবিয়ার বন্দিশালায় জিম্মিদের হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দিচ্ছে।

জিম্মি রবিউল খলিফার বাবা ইউসুফ খলিফা বলেন, আমার ছেলেকে ওরা জিম্মি করে কয়েক দফায় মুক্তিপর আদায় করেছে। আমি প্রশাসনকে জানানো কারণে ওরা আরো ক্ষিপ্ত হয়েছে। ওই চক্রের সদস্যদের ছেড়ে না দিলে আমার ছেলে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছে।

র‌্যাব-৮ মাদারীপুর ক্যাম্পের কমান্ডর মেজর রাকিবুজ্জান বলেন, চক্রটির একাধিক সদস্যদের আমরা গ্রেফতার করেছি। অপরাধীদের গ্রেফতারে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *